সোমবার ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ২২:০১
যাদের যেতে বলেছিলেন রাতে,
তাদেরই লাশ কাঁধে তুলেছিলেন দিনে 
— কারবালার নীরব আর্তনাদ!

কারবালা কোনো যুদ্ধক্ষেত্র ছিল না— কারবালা ছিল মানুষ ও বিবেকের শেষ পরীক্ষা।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,

রিপোর্ট: মুস্তাক আহমদ

কারবালা কোনো যুদ্ধক্ষেত্র ছিল না— কারবালা ছিল মানুষ ও বিবেকের শেষ পরীক্ষা। সেখানে তরবারির চেয়ে ধারালো ছিল ঈমানী সিদ্ধান্ত, আর রক্তের চেয়ে ভারী ছিল ভালোবাসা। আশুরার রাতে, ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত দৃশ্যটি ঘটে।
ইমাম হুসাইন (আলাইহিস সালাম) চেরাগ নিভিয়ে দিলেন। চারপাশ অন্ধকার। কোনো লজ্জা করো না,  কোনো অভিযোগ নেই। এমত অবস্থায় তিনি বললেন—
“যে চলে যেতে চাও, চলে যাও। আমি তোমাদের থেকে বাইআত তুলে নিলাম। শত্রুরা আমাকে চায়, তোমাদের নয়।”
এই কথার ভেতর ছিল— মুক্তি, নিরাপত্তা, দুনিয়াবি ক্ষেত্রে আর দুদিন বেঁচে থাকার সুযোগ৷ আর তার সাথে ছিল একটি অলৌকিক ঘোষণা— জান্নাত তোমাদের জন্য প্রস্তুত।

কিন্তু ইতিহাস স্তব্ধ হয়ে গেল। কেউ গেল না। একজনও না। কারণ তারা জানত— হুসাইনকে ছেড়ে বেঁচে থাকা মানে শ্বাস আছে, হায়াত নেই জীবন নেই।

রাতের সেই প্রস্তাবই দিনের লাশ হয়ে উঠল, আশুরার দিন এলো। সূর্য উঠল রক্তের আলো নিয়ে। যারা রাতে চলে যেতে পারত, তারা দিনে একে একে শহীদ হতে লাগল। আর সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি হলো—
ইমাম হুসাইন (আঃ) নিজ হাতে, নিজ কাঁধে, নিজ বুকের ওপর তুলে নিলেন তাদেরই রক্তাক্ত লাশ, অথচ তাদেরকেই তিনি আগের রাতে চলে যেতে বলেছিলেন।

এটা কি শুধু দৃশ্য?
না। এটা ছিল ঐশী নিদর্শন। প্রেমের বাতি ইমাম হুসাইন আঃ তাঁর এই নিদর্শন আমাদের শেখালো—
(১) নবীভক্তি, হুসাইনী ভালোবাসা কাগজে লেখা অঙ্গীকার নয়,
(২) আহলে বাইতর ভালোবাসা হলো শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত অবস্থান।

কারবালার প্রথম নিদর্শন: প্রেমের স্বাধীনতা
——— আশুরার রাত শেখায়—
হুসাইন কাউকে জোর করেননি।
তিনি বলেননি— “থাকতেই হবে।”
তিনি বলেননি— “না থাকলে বেঈমান।”
তিনি দিয়েছেন স্বাধীনতা। (এটাই ইসলাম)
কারণ— ইমাম হুসাইনের কাফেলায় কেউ ভয় থেকে ছিল না, কেউ লোভ থেকে ছিল না।
সবাই ছিল প্রেম থেকে। এটাই হুসাইনী চেতনা—
যেখানে আনুগত্য জন্মায় হৃদয় থেকে, চাপ থেকে নয়।

কারবালার দ্বিতীয় নিদর্শন: প্রেমের মূল্য
——— কিন্তু আশুরার দিন শেখায়—
এই প্রেমের মূল্য আছে।
যে কোরআন ও আহলে বাইতের মহব্বত নিয়ে বাঁচে,
সে জানে— এই পথ ফুলের নয়, এই পথ কাঁটার।
যারা রাতে দাঁড়িয়ে ছিল, তারা দিনে রক্তে ভিজে গেল।
আর ইমাম হুসাইন (আঃ) নিজ হাতে প্রমাণ করলেন—
তিনি শুধু নেতা নন, তিনি সবার আগে শোকবাহক।
তিনি দেখিয়ে দিলেন— হুসাইনী হওয়া মানে শুধু “ইয়া হুসাইন” বলা নয়, হুসাইনী হওয়া মানে অপর হুসাইনীচেতনা সম্পন্ন ভাইয়ের শহীদের লাশ কাঁধে নেওয়ার শক্তি রাখা।

এই দুটি নিদর্শন কিয়ামত পর্যন্ত কী শিক্ষা দেয়?
——— এই দুটি দৃশ্য একসাথে দাঁড়িয়ে আমাদের শেখায়
(ক) কোরআন ও আহলে বাইতের মহব্বত নিয়ে দুনিয়াতে বেঁচে থাকা মানে— তুমি আজও কারবালার ময়দানেই দাঁড়িয়ে আছো। কারবালা কোনো জাগা নয়, আশুরা কোনো তারিখ নয়, কারবালা একটি ঈমানী চেতনার অবস্থান।

(খ) হুসাইনী চেতনা নিয়ে বেঁচে থাকা মানে—
একদিন তোমাকেও মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে।
সে মূল্য হতে পারে— অপমান, নিঃসঙ্গতা, ত্যাগ, ঘর ছাড়া, পরিবার ছাড়া, সামাজিক বয়কট,  অথবা রক্ত বহমান 
(গ) আর সবচেয়ে কঠিন সত্য— হুসাইনী চেতনা সম্পন্ন হওয়া মানে, তোমার চোখে অশ্রু নিয়ে আরেকজন হুসাইনী প্রেমিকের রক্তাক্ত লাশ তুলতে প্রস্তুত থাকা।
কারণ সবসময় সবাই শহীদ হয় না— কেউ কেউ বেঁচে থাকে, শহীদদের পরিবারের দুঃখ নিবারনের বোঝা, শহীদদের পরিবারের সাংসারিক বোঝার ভার বহন করার জন্য।

হুসাইন চেতনা আজও জিজ্ঞেস করেন আজও আশুরার রাত আসে সেই চেতনার আলো, আজও আশুরার দিন আসে চেতনার ভারী স্বপ্ন। আর হুসাইন চেতনা আজও জিজ্ঞেস করেঃ — “তুমি কি আমার সাথে আছো, নাকি শুধু আমার নামের সাথে আছো?”

অথব কারবালা বা আশুরা আমাদের শুধু একটু মাসায়েব আর একটু কাঁদাবার আসে না, আশুরা ও কারবালা আমাদের মাঝে বার বার আসে আমাদের এক দায়িত্ব বোধের চেতনা নিয়ে দাঁড় করাতে আসে।

যে দাঁড়াতে পারে— সেই হুসাইনী।
আর যে দাঁড়ায়— সে জানে, হুসাইন কখনো একা থাকেন না। আর যে শুধু নাম নিয়ে চিৎকার করে তারা যুগের অলিগলিতে হারিয়ে যায়৷

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha